Contest Home | চারুবালা
আমি তখন ছোট্ট এক ছেলে; বয়স হবে সাত বা আট। হয়তো তোমরা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু আমি সত্যিই এক ভূতের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়েছিলাম। আজ সেই ঘটনার কথা তোমাদের বলছি। তোমরাই বিচার করো, সত্যি না মিথ্যে।
সেই সময় ছিল শারদীয়া ছুটির। আমি মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। হাওড়া থেকে দূরে, বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রামের নামটা না হয় গোপনই থাক, শুধু বলি - হাওড়া স্টেশন থেকে একটা লোকাল ট্রেনে করে নামতে হত একটা ছোট্ট একটা রেলস্টেশনে। সেখান থেকে আবার চল্লিশ মিনিট বাসে চড়তে হত।
ভাঙাচোরা রাস্তায় বাসের ঝাঁকুনিতে শরীরের সব হাড় যেন খুলে যেত, কিন্তু জানলার বাইরে চোখ রাখলেই মনটা অন্য জগতে চলে যেত। ধানখেতের বুক চিরে চলে গেছে পথ, পথের দু’ধারে ছোট ছোট মাটির বাড়ি, মাঝে মাঝে কাঁঠালের বাগান। সবুজের মাঝে সোনালী রোদের ঝিলিক, মাঠে কর্মরত লোকজন - এই পথ যেন নিজেই একটা গল্প বলে চলতো। আর কীভাবে যে সময় কেটে যেত, বুঝতেই পারতাম না - কখন যে মামার বাড়ি পৌঁছে যেতাম!"
বাস থেকে নেমে আরও ১৫ মিনিট হাঁটতে হয় গ্রামের রাস্তা ধরে। আমার মামার বাড়ি খুবই বড় এবং পুরোনো। একটু বাড়ির বিবরণ না দিলে তোমরা ঠিক বুঝতে পারবে না। বাড়িটা একটি পাঁচিলঘেরা বড় বাগানের মাঝখানে অবস্থিত। গেট থেকে বাঁধানো একটি পথ চলে গেছে বিশাল বড় সেই বাড়িটিতে। বাড়ির চারপাশে সারি সারি লম্বা সুপারি আর নারকেল গাছ। সেই গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে। আর বাড়ির পেছনে রয়েছে সান বাঁধানো ঘাটসহ একটি পুকুর। গেট আর পাঁচিলের বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন শুধুই একটি বাগান। সেই বিশাল বাড়িটিকে বাইরে থেকে একদমই বোঝা যায় না।
সেবার মামার বাড়ি থাকাকালীন এক সন্ধেবেলা কোনো এক কারণে আমি মামার কাছে বকুনি খেয়ে রাগ করে ছাদে উঠে যাই। বাড়িটির ছাদটা বেশ বড়, আর চারদিক ঘেরা ছিল প্রায় ৩-৪ ফুট উঁচু (মানে অর্ধেক মানুষ সমান) এক পাঁচিল দিয়ে। ছাদের একদম মাঝ খান দিযে সিঁড়ি উঠেছে,যার মাথায় ছিল চিলেকোঠার ঘর। চিলেকোঠার ঘরের ভেতরে একটা ভাঙা টেবিল, দুটো আধভাঙা বেতএর চেয়ারের সঙ্গে আরও কিছু পুরনো ভাঙা আসবাবপত্র থাকত। আমি আর মামা কখনো কখনো বিকেলের দিকে ওই ঘরে বসে গল্প করতাম।
আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যার আধো-অন্ধকারে আমি ওই চিলেকোঠার ঘরে বসে ছিলাম। গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরমে ঘরটা ছিল গুমোট, কিন্তু আমার মন ছিল তার থেকেও বেশি গুমোট - বকুনি খেয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম।
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হতে শুরু করল। কোথা থেকে যেন এক মিষ্টি হাওয়া ক্ষণে ক্ষণে এসে আমাকে এক আশ্চর্য আরামদায়ক অনুভূতি দিচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ পর মনটা আপনি ঠান্ডা হয়ে এলো।
আমি চিলেকোঠার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি - নারকেল আর সুপারি গাছের পাতাগুলো একটুও নড়ছে না।
তাহলে ঘরের ভেতরে আমার গায়ে, ঘাড়ে, এমনকি কানের পাশে এত মনোরম ঠান্ডা হাওয়া লাগছে কীভাবে? আজও সেই আশ্চর্য অনুভূতির কথা মনে আছে - যেন কেউ আমার রাগটুকু মুছে দিয়ে মনটা শান্ত করে দিলো।
সেদিন আর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে যখন নিচে নেমে যাই, তখন মনের গুমোট আর নেই।
সেদিন রাতে আমি, মা, মামা আর দিদা - সবাই মিলে একসাথে খেতে বসেছিলাম।
কিছুক্ষণ খাবার পর মামা আমায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কিরে, তখন রাগ করে কোথায় গিয়ে বসেছিলি? আমি তোকে অনেক খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না।'
আমি বললাম, 'আমি চিলেকোঠায় বসেছিলাম।'
মামা একটু থেমে, আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, 'সন্ধে বেলায় একা ছাদে উঠে গেছিলি? তুই জানিস না, ছাদে একটা ভূত থাকে?'
মামার কথায় আমার রাগটা আবার চড়ে গেল। আমি বললাম, 'সেটা হতেই পারে না। আমায় ভয় দেখানোর চেষ্টা কোরো না। আমি ভূতে বিশ্বাস করি না - ভূত বলে কিছু হয় না।'
আমার রাগ দেখে মামা প্রথমে ভ্রু কুঁচকালেন, তারপর হালকা হেসে বললেন, 'ভয় দেখাইনি। পরে মা বা দিদাকে জিজ্ঞেস করে দেখিস।'
আমি তখন মায়ের আর দিদার দিকে তাকালাম। ওরা চুপ করে সম্মতি জানাল।
কিন্তু আমি আর কিছু বললাম না।
পরের দিন দুপুরবেলায়, ঘুমানোর সময়, আমি দিদাকে বললাম—
'তুমি তো কাল শুনলে, মামা বলল ছাদে একটা ভূত থাকে। আর তুমি আর মা দুজনেই মাথা নেড়ে সায় দিলে। ভূত বলে কি কিছু হয়? হয় না তো!'
দিদা একটু হেসে বললেন,
'জানিস দাদা, আমি যখন প্রথম এই বাড়িতে শ্বশুরবাড়ি এলাম, তখন ছাদের ওই চিলেকোঠার ঘরটাই ছিল আমাদের ঠাকুরঘর।
আর আমি এসেই পেলাম সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরঘরে সন্ধ্যে দেবার দায়িত্ব।
আমি যখন সন্ধ্যেয় ছাদে সন্ধ্যে দিতে যেতাম, ছাদে ওঠার সিঁড়ির অর্ধেক উঠতেই মনে হতো, যেন কেউ আমার পেছন পেছন পা ফেলে উঠছে।
আমি বারবার পিছন ফিরে দেখতাম—কেউ আছে কিনা।
আর শুধু তাই নয়, যখন ঠাকুরঘরে বসে পুজো করতাম, মনে হতো কেউ যেন আমার পিছনে বসে আছে।
একটা হালকা নিঃশ্বাসের শব্দ, যেন আমার ঘাড়ের কাছে পড়ে।
এমন কিছুদিন চলার পর আমি ভয় পেয়ে গিয়ে আমার দিদিশাশুড়িকে সব বললাম।
দিদিশাশুড়ি বলেন—উনি হচ্ছেন চারুবালা। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, উনি কিছু করেন না।
দাদা, তারপর থেকে আমি আর একা সন্ধ্যে দিতে যাইনি। কাউকে না কাউকে সঙ্গে নিয়েই যেতাম।
তবে জানিস দাদা, উনি কোনোদিন কারো কোনো ক্ষতি করেননি।
আমি বললাম,
"সত্যিই কি তাই হতে পারে দিদুন? আমার মনে হয় তোমার ভুল হতে পারে। আর ওই চারুবালাই বা কে? তুমি কী করে বলতে পারো, সে কারও ক্ষতি করবে না?"
দিদা বললেন,
"ভয় পেয়েই তোর দাদু একবার তারাপীঠের এক সিদ্ধ সন্ন্যাসীকে ডেকে আনেন। উনি আমাদের বাড়িতে পূজাযজ্ঞ করিয়েছিলেন।
সন্ন্যাসী বলেছিলেন—
‘থাকুক না ও। ও তোদের কোনো ক্ষতি করবে না। বরং কোনো অমঙ্গল আসার আগে তোদের নানা উপায়ে সাবধান করে দেবে। তখন তোরা ওর উপস্থিতি বেশি করে টের পাবি। কিন্তু ভয় পাবি না—ও শুধু জানান দেবে, ক্ষতি করবে না।’
দিদা বললেন,
'আমার দিদিশাশুড়ি বলেছিলেন, চারুবালা আমাদের বংশের কেউ নন। এই বাড়ি তৈরির আগে যারা এখানে থাকতেন, তাদের মেয়ে ছিল চারুবালা।
কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে।
তাদের পরিবার এখান থেকে চলে গেলে, আমরা এই জায়গা কিনে বাড়ি বানাই। কিন্তু চারুবালা হয়তো এই জায়গাটা ছাড়তে পারেনি...'
আমি বললাম, 'ধুৎ দিদুন! তুমি তো খুব ভীতু!'
দিদা একটু হেসে বললেন, 'আমি একা না দাদা, আমার আগেও অনেকেই চারুবালার উপস্থিতি অনুভব করেছেন। আমার শাশুড়িমা, এমনকি তোর দাদুও। ওর কথা আগে থেকেই বলতেন সবাই।'
সেই দিন বিকেলবেলায় আমি আর ছাদে গেলাম না। কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। চারুবালাকে কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না।
ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল ওর সম্পর্কে আরও কিছু জানার।
দিদা তো বলেছিলেন, সবাই কোনও না কোনওভাবে চারুবালাকে অনুভব করেছে।
তবু মনে হচ্ছিল, কেউ যদি ভাবে আমি ভূতে ভয় পাচ্ছি? তাই আর কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না।
তবে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—
আমি তো আগেও বহুবার মামার বাড়ি এসেছি!
তখন তো কেউ চারুবালার কথা বলেনি!
তবে কি তখন আমি ছোট ছিলাম বলেই?
সেই দিন রাতে, খাবার আগে একতলার ছাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
চারপাশে গাছের পাতায় চাঁদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছিল।
আকাশটা পরিষ্কার ছিল, চাঁদটা বড় আর উজ্জ্বল।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল দোতলার চিলেকোঠার ঘরের দিকে।
এখান থেকে ঘরের দরজার উপরের দিকটা দেখা যাচ্ছিল।
দরজাটা অল্প একটু ফাঁক ছিল—মনে হলো আজ সেটা ভালোভাবে বন্ধ করা হয়নি।
আমি কিছু ভাবছিলাম না—শুধু তাকিয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই একটা সাদা পেঁচা উড়ে এসে চিলেকোঠার ঘরের ছাদে বসলো।
আধো-অন্ধকারেও মনে হলো ওটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
পেঁচা আগে বহুবার দেখেছি। এখানে ওরা খুবই সাধারণ।
তবু না জানি কেন, সেই মুহূর্তে পেঁচাটাকে দেখে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল পিঠের নিচ দিয়ে।
আমি আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেলাম..
রাতের খাবারের টেবিলে বসে বারবার মনে হচ্ছিল চারুবালার কথা জিজ্ঞেস করি।
কিন্তু কেউ যদি ভাবে আমি ভীতু?
তাই কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। শুধু বললাম,
“ওপরে চিলেকোঠার ঘরটা খোলা আছে, কেউ বোধহয় বন্ধ করেনি।”
মামা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
“ওই ঘরটা তো বন্ধ করা হয় না। সবসময় খোলা থাকে। কাল তো বললাম, চারুবালা থাকে ওই ঘরেই।”
বলেই মাথা নিচু করে খেতে লাগল।
আমার খুব রাগ হলো। আমি বুঝতেই পারছিলাম না—ও সত্যি বলছে, না আমাকে ভয় দেখাচ্ছে।
পাছে সবাই ভাবে আমি ভয় পাচ্ছি, তাই আমি আর কিছু বললাম না।
মা মামাকে বলল,
“তুই কেন ওকে ভয় দেখাচ্ছিস ভাই?”
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
“না না, আমি তো বিশ্বাসই করি না এসব। ভূত-টুত কিছু হয় না!”
মামা এবার মাকে বলল,
“কেন দিদি, বিয়ের আগে যখন তুই এখানে ছিলি, রাত জেগে পড়তিস, তুই কি ছাদের শব্দ শুনিসনি?”
মা একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তা ঠিক, কিন্তু, শুনেছি। আগে যখন রাত জেগে পড়াশোনা করতাম, অনেক রাতে চারপাশ যখন নিঃস্তব্ধ হয়ে যেত - তখন ছাদ থেকে জোরে হাঁটার আওয়াজ, বা ধপ ধপ করে চলাফেরার শব্দ পেতাম। একবার না, বহুবার। একদিনে তো দু-তিনবারও শুনেছি। খুব স্পষ্ট।”
আমি বললাম, “মা, তুমি কি মিথ্যে বলছ? আমায় ভয় দেখানোর জন্য?”
মা হেসে বলল, “না রে, সত্যিই বলছি। তবে ভয় পাবার কিছু নেই ”
মামাকে বললো, “আচ্ছা, ভাই। এখনো কি শুনতে পাস?”
মামা বলল, “কি জানি? ইদানিং এর মধ্যে খেয়াল করিনি। তবে হয় হয়তো । তবে সাধারণত মাঝরাতের দিকে হয়। তখন তো কেউ জেগে থাকে না।”
আমি বললাম, “তাহলে চল, আজ রাতে আমি জেগে থাকব। নিজে কানে শুনে দেখব! কেমন হয় শব্দ! নাকি সব মিছে কথা। ”
মামা একটু হেসে বলল, “একদিনেই নাও শুনতে পেতে পারিস।”
আমি বললাম, “একমাস আছি,”
দিদা এবার একটু চিন্তিত মুখে বললেন, “কি দরকার বাবা! তিনি আছেন, থাক না।”
=============================
সেই দিন রাতে ডিনার শেষ করে আমি মায়ের সঙ্গে শুতে গেলাম।
কিন্তু যথারীতি ঘুমালাম না—ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে অপেক্ষা করতে থাকলাম শব্দ শোনার জন্য।
বারান্দার পুরনো দম-দেওয়া বড় কাঠের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটা বাজলো।
মা পাশ ফিরে শোবার সময় আমাকে জেগে থাকতে দেখে বলল,
“কিরে, এখনো ঘুমাসনি কেন?”
আমি বললাম,
“কিছু না, ঘুম আসছে না।”
তারপর থাকতে না পেরে প্রায় জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,
“আচ্ছা মা, তুমি কি সত্যিই বলছ, তুমি চারুবালার পায়ের শব্দ শুনেছ?”
মা একটু চুপ করে থেকে বলল,
“দেখ, শুনেছি। ভুল হবার নয়।
যখন রাত জেগে পড়তাম, প্রায়ই শুনতাম—অনেক রাতে, নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতায় খুব স্পষ্ট শোনা যেত। এখানে তো রাতগুলো এমনিতেই খুব শান্ত।
মাঝে মাঝে মনে হতো, যেন নূপুর পায়ে কেউ হেঁটে চলেছে।”
আমি মায়ের পাশে ঘেঁষে শুলাম। জিজ্ঞাসা করলাম,
“ভয় পেতে না মা?”
মা বলল,
“না, ছোটবেলা থেকেই এসব গল্প শুনে বড় হয়েছি তো। আর শব্দগুলো এতবার শুনেছি যে, কেমন একটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, মাঝরাতে ছাদে গিয়ে কখনো দেখিনি। তবে ভাই, মানে তোর ছোট মামা, তোর মতোই ছিল—বিশ্বাস করত না। তাই ও অনেকবার ছাদে গিয়ে দেখেছে। কিছু পায়নি। শুধু একটা সাদা পেঁচা থাকে—এটাই বলতো।”
আমি বললাম,
“তবে মামা যে বলল ছাদে যাবি না, চারুবালা আছে... মামাও তো বিশ্বাস করত না তাহলে?”
মা বলল,
“সে তো জানি না। তুই ওকে নিজেই জিজ্ঞেস করিস।
এখন ঘুমা।”
এই বলে মা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো।
বাইরে একটা পেঁচা ডেকে উঠলো। সেই সাদা পেঁচাটা কি?
গা একটু সিউড়ে উঠলো।
কিন্তু আমি ঘুমাতে পারলাম না।
অপেক্ষা করতে থাকলাম... ওই শব্দটার জন্য।
ভোররাতে একটা শব্দ পেয়ে আমি উঠে বসলাম।
পাশে মা ঘুমোচ্ছে। আমি আস্তে আস্তে, কোনো শব্দ না করে সিঁড়ির দিকে এগোলাম।
হঠাৎ আবার সেই আওয়াজটা কানে এলো—
এইবার অনেকটা কাছ থেকে।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখি চিলেকোঠার ঘরটা খোলা।
ভেতর থেকে ছোট মামার গলা! আমার নাম ধরে ডাকছে।
আমি এগোতেই দেখি... ঘরে কেউ নেই।
শুধু একটা বড় সাদা পেঁচা, আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আমার মুখ দিয়ে নিজের অজান্তে বেরিয়ে পড়লো—
“চারুবালা...”
আবার শুনলাম—
একেবারে স্পষ্ট—আমার নাম!
ধড়মড় করে উঠে দেখি—
ছোট মামা আমায় ডাকছে।
জানিনা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কাল রাতে।
স্বপ্ন দেখছিলাম।
মামা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল,
“তুই কি চারুবালার স্বপ্ন দেখছিলি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ‘চারুবালা’ বললি, মনে হলো।”
আমি বললাম,
“না তো।”
============================
মামা আর কিছু না বলে কাজে চলে গেল। দুপুরবেলায় আমি আর মামা একসাথে খেয়ে মামার ঘরে শুতে গেলাম। মামার আর আমার ঝগড়া তা এখন প্রায় মিটেই গেছে। দুপুরে আমার বা মামার কারোরই ঘুম হয় না—বই পড়ি বা গল্প করি। তাই, চিলেকোঠার চারুবালার ঘরে বসেই আড্ডা দিতাম। আজ ঘরেই শুয়ে ছিলাম। কেন জানি না, নিজে থেকে মামাকে চারুবালার কথা জিজ্ঞেস করতে পারছিলাম না। শুধু মনে হচ্ছিল, মামা যদি আমায় খুব ভীতু ভাবে!
হঠাৎ মামাই জিজ্ঞেস করল,
— "কিরে, সকালে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চারুবালা বলছিলি কেন আজ?"
আমি বললাম,
— "আবার না গো! আমি তো কিছু বলিনি!"
মামা বলল,
— "না, আমি স্পষ্ট শুনেছি!"
আমি বললাম,
— "মা বলছিল, তুমি তো চারুবালায় বিশ্বাস করো না! তুমিই তো ছাদে গিয়ে দেখে আসতে, কেউ আছে কিনা। তাহলে আমায় ভয় দেখাচ্ছ কেন?"
মামা হেসে বলল,
— "আচ্ছা, এই বাড়িটা কে তৈরি করেছে তার নাম জানিস? মানে, তোর দাদুর দাদু—তার নাম?"
আমি মাথা নাড়লাম।
— "তোর মাকে, দিদাকে জিজ্ঞেস করিস, বলতে পারবে না একচান্সে, অনেক ভেবেও মনে করতে পারবে না হয় তো। অথচ তারও অনেক আগে মারা যাওয়া চারুবালার নাম সবাই মনে রেখেছে। সে তো আমাদের ফ্যামিলির কেউ হয়ও না! কেন?"
আমি বললাম,
— "ভয় পায় বলে।"
মামা বলল,
— "কিছু নেই তো ভয় কিসে পায়। তোর দাদু, তার বাবা, তার বাবা, - সবাই মারা গেছে এই বাড়িতেই। কই তাদের তো কেউ ভয় পায় না? চারুবালাকে নিয়েই এই ভয়? আর সেতো আজ পর্যন্ত কিছু করেনি কাউকে!"
আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। সব কেমন যেন গোলমেলে লাগলো।
বললাম,
— "তুমি কি বলতে চাও চারুবালার ভূত আছে? তুমি দেখেছো? সাদা পেঁচা হয়ে?"
মামা একটু চুপ করে থেকে বলল,
— "চারুবালা তো সেই কবে মরে গেছে, সে অতীত। কিন্তু আজও যদি সকলে ভূত বলে শুধু চারুবালাকেই অনুভব করে—তবে আমি কি বলতে পারি বল?"
আমি আর কিছু বললাম না। মামাও কি একটা বই পড়তে লাগলো।
=======================
রাত্রে ডিনার শেষ করে মামার সাথে শুতে গেলাম। মামা ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু আমি অপেক্ষা করে রইলাম। কেন জানি না, চারুবালা যেন আমার মাথা থেকে কিছুতেই বেরোচ্ছে না। সেই সব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ যেন একটা শব্দ কানে এলো—ঠিক যেন ভারী কিছু ছাদে পড়ে যাওয়ার শব্দ।
আমি মামার দিকে তাকালাম। মামা তখন ঘুমিয়ে। যদি জেগে থাকত, তাহলে হয়তো বলা যেত, এটাই কি সেই চারুবালার শব্দ?
বাইরের বড় ঘড়িতে “ঢং” করে একটা বাজল। নিশুতি রাত। নিঃশব্দ চারিদিক।
ওই শব্দ শোনার পর থেকে আমার সব ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পর আবার একটা শব্দ হলো। খুব স্পষ্ট—এটা ভুল শোনার সুযোগই নেই।
তারপর মনে হল, কেউ যেন ধীরে ধীরে পা ফেলে হেঁটে চিলেকোঠার ঘরের দিকে যাচ্ছে।
ওই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না। গা-টা শিরশির করে উঠল। আমি মামার গা ঘেঁষে শুয়ে রইলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর সেই অদ্ভুত পায়ের শব্দ শুনতেই থাকলাম।
বাইরের ঘড়িতে “ঢং ঢং ঢং” করে তিনটে বাজল।
এমন সময় হঠাৎ দূরে কোথাও একটা পেঁচা "হুঁউ হুঁউ" করে ডেকে উঠল। কি করুন শোনালো ডাক টা তা বোঝানো যাবে না। ইটা কি ওই সাদা পেঁচা টা?
হঠাৎ মনে পড়ল দিদার কথা—দিদা বলেছিলেন,
“যখন বাড়ির ওপর কোনো বিপদ আসে, তখন চারুবালা খুব জোরে আওয়াজ করে সেটা জানান দেয়।”
আজ তো আমি অনেকবার চারুবালার আওয়াজ শুনলাম!
তবে কি সত্যিই কোনো বিপদ আসন্ন?
================
পরের দিন যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। ছাদ থেকে ভেসে আসা মামার গলার শব্দ শুনে, ব্রাশ আর মাজন হাতে সোজা ছাদে উঠে গেলাম।
গিয়ে দেখি, ছাদে কেউ নেই। হয়তো ভুল শুনেছিলাম। চিলেকোঠার ঘরের দরজাটা হালকা ভেজানো। দরজা খুলে ঢুকব কি না একটু ভেবে, ধীরে ধীরে ঠেলে ভেতরে ঢুকে দাঁড়ালাম। ঘরটা যেন একেবারেই স্বাভাবিক—যেমন ছিল, তেমনই। ছাদেও কিছু বদলায়নি। ছাদের পিছনের দিকে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি, নিচে মামা পুকুরঘাটের সান বাঁধানো ঘাটে দুজন কাজের লোকের সঙ্গে কিছু একটা বলছে। মামা বাইরে যাওয়ার নতুন জামা পরে পুরো রেডি।
ওকে দেখেই কেন জানি না, হঠাৎ কাল রাতের ঘটনাটা ঝাঁপিয়ে এলো মনে। চারুবালার পায়ের আওয়াজ শুনেছিলাম বারবার। মনে হলো... কিছু একটা হতে চলেছে। একটা অদ্ভুত অস্থিরতা চেপে বসলো বুকের মধ্যে। কাল রাতেও তো তাহলে কি সেই "আসন্ন বিপদ" আজ?
আমি আর দেরি না করে জোরে জোরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম নিচে। সোজা গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
"মা, মামা কোথায় যাচ্ছে?"
মা বললো, "মনে হয় মামা দু’দিনের জন্য কলকাতা যাবে, কিছু জিনিস কিনে আনতে। পরশুদিন ফিরে আসবে।"
হঠাৎ মনের মধ্যে আরও প্রবল জোরে যেন কেউ বাধা দিতে চাইলো। আমি বললাম, "আমি এই ক’দিনের জন্য এলাম, আর মামা চলে যাবে কাজে?"
মা বললো, "এক দিনের জন্য তো। কাজ কি আটকে থাকে?"
আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, পিছনের দরজা দিয়ে মামা বাড়িতে ঢুকছে।
আমি: মামা, তুমি কোথায় যাচ্ছো?
মামা: আরে! উঠলি? কোলকাতা যাচ্ছি দু’দিনের জন্য, কিছু জিনিস কেনার আছে। তোর জন্য কিছু আনবো নাকি?
আমি: (অস্থিরভাবে) কিন্তু এখন যেও না মামা। প্লিজ!
মামা: কেন রে? কি হয়েছে?
কি হয়েছে আমি মামাকে কি করে বলি! মা আমাকে বকা দিয়ে উঠল, 'মামার কি কাজ নেই?'
আমি বললাম, 'মামা, তুমি যেও না।' বলতে বলতেই আমার কান্না পেয়ে গেল। আমি দৌড়ে ওপরে ঘরে চলে গেলাম।
যাই হোক, আমার সেই কান্নার জন্যই সেদিন মামার যাওয়া হয়নি।
রাতে খাবার টেবিলে মামার কাছে শুনলাম, আমাদের গ্রাম হয়ে যে বাসটা রেলস্টেশনে যায়, সেটার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। ড্রাইভার ঘটনাস্থলেই মারা গেছে, আর জনা দশেক যাত্রী খুব গুরুতর আহত।
দিদা বলল,
'ভাগ্যিস খোকার মনে কু ডেকেছিল, তাই আজ তুই যাসনি!'
আমি আর কাউকে কিছু বললাম না। সত্যিই আমার মনে কু ডেকেছিল? নাকি চারুবালা কোনোভাবে জানিয়ে দিয়েছিল? না কি... সবটাই শুধুই একটা কাকতালীয় ঘটনা?"
Critics Section
Subscribe to Writing Contest
Group Chat
No chat available for this WritingContestEntry yet.
Login to ChatContest Info
- Contest Name: ছোটগল্প - সাসপেন্স
- Created by: Raju Das
- Allowed Entries: 1
- Start: 30 Aug 2025
- Entry Close: 19 Sep 2025
- Vote Close: 26 Sep 2025
- Min Words: 100
- Max Words: 5500