Contest Home | এক পশলা বৃষ্টি
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে চারপাশ ভিজে গেছে। জানলার কাঁচে আঙুল ছুঁইয়ে চুপচাপ বসে আছে ঐশী। বহুদিন পর আজ ডায়েরিটা খুলেছে সে। পাতাগুলো যেন ধুলো জমে গেছে, তেমনি তার অনুভূতিগুলোরও দীর্ঘদিন স্তব্ধ হয়ে ছিল।
জীবনটা সহজ ছিল না। ভাঙা স্বপ্ন, দীর্ঘ রাতের নির্ঘুমতা, নিঃসঙ্গতা, বিশ্বাসভঙ্গ আর নিজের সঙ্গে নীরব যুদ্ধ - সব কিছু মিলিয়ে একটা বোঝা হয়ে উঠেছিল সে। নিজের কথা কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেনি কখনো, তাই ডায়েরিটাই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। মাঝপথে সেটাও ছেড়ে দিয়েছিল... লেখা, অনুভব, নিজেকে বোঝা - সব হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আজকের এই এক পশলা বৃষ্টি যেন ভেতরের জমে থাকা ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে গেছে। আগের মতো সেই দমবন্ধ ভাব আর নেই। জীবনের ঝড় থেমে গেছে। মুখে এখন প্রশান্তির ছায়া।
ডায়েরির প্রথম পাতায় কলম ছুঁইতেই সে লিখে ফেলল --
“আজ অনেক দিন পর আবার লিখছি... হয়তো নিজের সঙ্গে একটু কথা বলার সময় হয়েছে।”
কিছু মানুষ জীবনে এসে এতটা আপন হয়ে যায় যে, বিশ্বাসই হয় না এই মানুষটা একদিন ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। ঐশীর জীবনের তেমনই এক মানুষ - তন্বী। ছোট্ট, ফুটফুটে এক পরি।
তন্বী ঐশীর নিজের সন্তান নয়, রক্তের সম্পর্কও নেই। তবু এক অদ্ভুত টান, এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা পড়েছে তারা। তন্বীর “মা” ডাকা, তার ছোট ছোট প্রশ্ন, নিঃশর্ত ভালোবাসার মধ্যে ঐশী খুঁজে পেয়েছে জীবনের সমস্ত হারানো রঙগুলো।
স্কুলজীবনে ঐশী ছিল অসম্ভব মেধাবী। স্বপ্ন ছিল - একদিন আদর্শ শিক্ষিকা হবে সে, যে শুধু জ্ঞান দেবে না, ভালোবাসাও ছড়াবে। কিন্তু মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হয়ে স্বপ্ন দেখা সহজ নয়।
"মেয়ে হয়ে এত পড়াশোনার দরকার কী?"
"কিছু হলেই বিয়ে দিয়ে দাও, ঝামেলা মিটে যাবে।"
এই সব কথার ভেতর দিয়েই এগিয়েছিল ঐশী।
মাস্টার্স করার সময়েই বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংসারের চাপ, মায়ের চোখের জল - সব মিলিয়ে একসময় তাকে বিয়েতে রাজি হতে হয়।
তবে সে একটা শর্ত রেখেছিল - পড়াশোনা সে ছাড়বে না।
আর সেই স্বপ্নকে বোঝে এমন একজন মানুষই এসেছিল তার জীবনে - সম্বিত।
সম্বিত, ঐশীর স্বামী, প্রেমিক, সাথি।
ভীষণ ভালো মানুষ। ঐশীর কোনো স্বপ্নকে সে বাধা দেয়নি, বরং আপন করে নিয়েছে। ঐশীর মতো একজন নারীকে ভালো না বেসে থাকা অসম্ভব - সম্বিতও ভালোবেসেছে প্রাণ দিয়ে।
ঐশী মাস্টার্স শেষ করে একটি কলেজে যোগ দেয়। ওরা তখন স্বপ্ন গড়ছে দুজন মিলে। ছোট ছোট সুখে, একসাথে গল্পে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সময় কেটে যাচ্ছিল।
এই সময় থেকেই পরিবার থেকে চাপ আসে - "বাচ্চা কবে হবে?"
ঐশী আর সম্বিত যতটা সম্ভব সামলে নিচ্ছিল সব।
কিন্তু… সুখ কি সবাইকে সয়?
একদিন সন্ধেবেলা, ছাদে বসে কফি খেতে খেতে ঐশী হেসে বলছিল,
“এই কদিন ধরে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না... যা খাচ্ছি সবেতেই গা গুলিয়ে উঠছে।”
হঠাৎ ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সম্বিত উদ্বিগ্ন হল, কিন্তু বাড়ির লোকজন খুশি হয়ে বলল,
“মনে হচ্ছে কোনও সুখবর আসতে চলেছে!”
সম্বিত বলল,
“তবে তো কালই ভালো একজন ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার।”
ঐশী মনে মনে আনন্দে ভরে উঠল। পাঁচ-ছয় বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখ মিলিয়ে অনেক কিছু পেরিয়ে এসেছে তারা। এবার হয়তো সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটা অপেক্ষা করছে।
পরদিন ওরা গেল ডাক্তারের কাছে। কিছু টেস্ট করানো হল।
রিপোর্ট হাতে আসতেই সম্বিতের পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
ঐশী গর্ভবতী নয়। বরং সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ইউটেরাইন ক্যান্সারের।
ডাক্তারের ঠোঁটের জড়তা আর চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল - এটা খুব সাধারণ কিছু নয়।
সম্বিত ঐশীকে কিছুই জানাল না। বলল,
“আরও কিছু টেস্ট করতে বলেছে।”
বাড়ি ফিরে দু’জনে চুপচাপ।
রাতে, কথা না বলেই তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। ফুপিয়ে কাঁদল।
সব স্বপ্ন যেন এক লহমায় টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল।
চিকিৎসা শুরু হল। ধীরে ধীরে ঐশী এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ল যে কলেজের চাকরি ছাড়তে হল।
তারপর একদিন… ডাক্তার জানালেন, ঐশী আর কখনও মা হতে পারবে না।
ঐশীর ভেতরটা যেন একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল।
উচ্ছ্বাস ভরা মেয়েটি একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেল।
সম্বিত পাশে থেকেও কিছু করতে পারছিল না।
ঐশীর ইচ্ছেশক্তি ভেঙে পড়েছিল। চিকিৎসাতেও সাড়া মিলছিল না।
কাউন্সেলিং, অনুরোধ, আদর - সবই ব্যর্থ হচ্ছিল।
তখনই সম্বিত একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়।
সে মা-বাবার সঙ্গে আলোচনা করে, এক অনাথ আশ্রম থেকে একটা শিশুকে নিয়ে আসে।
ঐশীর সামনে শিশুটিকে তুলে ধরে বলল—
“এই যে, তোমার বাচ্চা।”
ঐশীর চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল…
কিন্তু সেই অশ্রুর সঙ্গে মিশে ছিল এক নতুন আশার আলো।
ঐশী শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
যেন জীবনের হাহাকার আর শুন্যতার অবসান হল সেই মুহূর্তে।
আজ ঐশী সম্পূর্ণ সুস্থ।
তার কোলে ফুটফুটে একটা মেয়ে - তন্বী।
হ্যাঁ, ঐশী তার মেয়ের নাম রেখেছে তন্বী।
তন্বী আজ তার জীবনের সব রং, সব আলো।
ঐশী আবার কলেজে ফিরবে খুব শীঘ্রই।
আর তন্বীকে নিজের মতো করে বড় করে তুলবে—ভালোবাসায়, সাহসে, শিক্ষায়।
সম্বিতের সেই এক সিদ্ধান্ত…
এক পশলা বৃষ্টির মতো তন্বীকে নিয়ে এসেছিল ঐশীর জীবনে।
ঠিক যেমন গুমট গরমের পর হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি মানুষকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে দেয়,
তেমনই তন্বীও যেন ঐশীর সমস্ত দুঃখ, যন্ত্রণা ধুয়ে মুছে দিয়েছে।
ঐশী আজ জানে—
জীবন সহজ নয়, কিন্তু ভালোবাসা থাকলে, পাশে কেউ থাকলে…
সব কিছু আবার নতুন করে শুরু করা যায়।
Critics Section
Subscribe to Writing Contest
Group Chat
No chat available for this WritingContestEntry yet.
Login to ChatContest Info
- Contest Name: রোমান্টিক ছোটগল্প প্রতিযোগিতা
- Created by: Raju Das
- Allowed Entries: 1
- Start: 30 Aug 2025
- Entry Close: 21 Sep 2025
- Vote Close: 26 Sep 2025
- Min Words: 100
- Max Words: 5000